- নিজস্ব প্রতিনিধি:-বেতবুনিয়া রিজার্ভ ফরেস্টের জমি বেদখল, হেডম্যান, কার্বারী এবং সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ! বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় হেডমান কারবারী শ্রেণী পরিবর্তন নতুন হোল্ডিং নং বসানোর চাঞ্চল্যকর তথ্যর অভিযোগ উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ ও ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের আওতাধীন রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমি বেদখল এবং অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ১৬,০৫৭.৪৮ একর বনভূমি জবরদখল হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৭২.৬১ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে ।
- বনবিভাগ সুত্রে জানা গেছে, ১৯২৭ সালের ১৬ নংবন আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ৪ জানুয়ারী জারী করার পর বেতবুনিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রির্জাভ ফরেষ্ট) ঘোষনা করা হয়। বেতবুনিয়া ও কাশখালী মৌজায় দশ হাজার ৯২০ একর ভুমি থাকলেও ৩২৯ একর রির্জাভ ফরেষ্ট এর বনাঞ্চলের প্রজ্ঞাপন জারী করে গেজেট আকারে প্রকাশ করে বনবিভাগ।
- আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা- অবৈধ দখলদাররা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- আদালতে নথিসুত্রে জানাগেছে, কলমপতি বিট ১৯৬০ সালে পা:ঝুমনিয়ন্ত্রন বনবিভাগে প্রতিষ্ঠিত হয়।নন্দিতা চৌধুরী জবর দখল ও তাদের ভুমি দাবী করে আসছে। প্রশাসকের আদালতে মামলা করা হলে ১৬৯৭ এবং১৭০৩ দাগের বাদীর কোন স্থাপনা নেই, ২৮/১০/২৪ তারিখে মামলায় এডিএম আদালতে খারিজ করে দেন। বেতবুনিয়া বনবিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৬৩২৯ একর মধ্য ৩৫৬৭ একর অংশে হাজী রাজা মিঞা গং (বর্তমানে মুছা ) ৩২৫০ একর সৃজনী ট্রাষ্ট জবর দখলের মধ্যে ৫৪ শতক উদ্ধার করা হয় । সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংশু প্রু চৌধুরী জবর দখলের মধ্যে ৫ একর উদ্ধার করে বিভিন্ন ফলের বাগান শুরু করেছে বলে বনবিভাগ সুত্রে জানাগেছে।
- পরিকল্পনার অভাব- নিয়মিত এবং সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযানের পরিবর্তে বিক্ষিপ্ত অভিযানের কারণে উচ্ছেদকৃত ভূমি পুনরায় দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা- পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় উচ্ছেদ অভিযানগুলো আইনি বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে
বন বিভাগের কাগজপত্র তথ্যমতে জানাগেছে – রিজার্ভ ফরেস্টের অধিকাংশ এলাকা দখল করে অবৈধ বসতি ও কটেজ নির্মাণ করায় বন বিভাগ উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছে
জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য বিভাগ: জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হলেও উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিত না হওয়ায় তা ঝিমিয়ে পড়ছেসুত্রে জানা যায়- ২০২৬ সালে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও, উদ্ধার হওয়া ভূমির পরিমাণ খুবই সামান্য। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত ও কঠোর উচ্ছেদ অভিযানের দাবি জানিয়ে আসছে যাতে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা যায়।
অবৈধ দখলদারিত্ব ও ভূমিকা- বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, হেডম্যান (ঐতিহ্যবাহী মৌজা প্রধান) এবং কার্বারীদের (গ্রাম প্রধান) একটি অংশ অনেক ক্ষেত্রে বনভূমি বা সরকারি জমি অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারীদের কাছে চিহ্নিত করে বা কাগজপত্রে সহায়তার মাধ্যমে বেদখলে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। এবং শ্রেণী পরিবর্তন করে নিজেদের মত হোল্ডিং নং বসানো অভিযোগ সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংশু প্রু চৌধুরী বিরুদ্ধে।
- জেলা পরিষদ ও প্রশাসন: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতি অনুযায়ী অবৈধভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া ভূমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিল করার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ ও ভূমি প্রশাসন অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদ করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও রির্জাভ ফরেষ্ট বেতবুনিয়া খাসখালী অধিকাংশ ভুমি বেদখলে করেছে অভিযোগ বনবিভাগের।
- কাশখালী -বেতবুনিয়া-কলমপতি-তিকোনিয়াসহ কাউখালীর প্রায় ১৮০৭ একর অধিক বেদখল রয়েছে বলে বনবিভাগ সুত্রে জানাগেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারে আমলে সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংশু প্রু চৌধুরী কৌশলে ডি-রির্জাভ প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বনবিভাগের কিছু জায়গা দখলমুক্ত করে চারা রোপন করেছেন। কলমপতি রাজামিঞা গং ৩৭.৭৫ একর জবর দখল করে একটি বিদ্যালয়ের কাছে দানপত্র মুলে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম ঝুম নিয়ন্ত্রন বনবিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো.তরিকুল রহমান প্রতিবেদককে বলেন, ১৯৬১ সালে গেজেট সৃষ্টির রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি ৫৬ হাজার একর ৪ ও ৬ ধারা রির্জাভ ঘোষনা করা হয়। রাঙ্গামাটিতে ২৫ হাজার রির্জাভ ফরেষ্ট ২০ ধারায় রের্কডভুক্ত ৬২৯ একর । প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারমতে ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপন করা হবে কাউখালীতে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ছারা রোপন করেছি ।
- রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সংরক্ষিত বনভূমি অবৈধভাবে কেটে বসতভিটা ও বাগান তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।
- ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের পদক্ষেপ: বন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গামাটির ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগ এবং দক্ষিণ বন বিভাগ এই এলাকায় নিয়মিত টহল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা ও নোটিশ প্রদান করে আসছে।
- বনবিভাগের দাবী বর্তমানে (২০২৪-২০২৬)পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ, রাঙ্গামাটির আওতাধীন কাপ্তাই ও কর্ণফুলী রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বিভিন্ন প্রকল্পের বাগান রক্ষায় বন বিভাগ নিয়মিত তদারকি করে আসছে বলে জানা গেছে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে, তবে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের কারণে তা পুরোপুরি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের প্রায় ৬,৩০৪ একর অধিক সংরক্ষিত বনভূমি অবৈধভাবে বেদখল বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
- বনবিভাগ সুত্রে জানায়:- পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। হেডম্যান-কার্বারী বা জেলা পরিষদ কর্তৃক কোনো জমি হস্তান্তর বা বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ আইনি নথিপত্র এবং বন বিভাগের ছাড়পত্র যাচাই করা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে বনবিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
- বনবিভাগে সুত্রে জানাগেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ১৯টি রেঞ্জের ৩৫টি বিটের কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ হাজার একর বনভূমি দখলে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বিভিন্ন সময়ে এসব জমি উদ্ধার করা হলেও কয়েক দিন পরেই তা আবারো দখল করে নেন দখলবাজরা। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানোও হয়েছে। বর্তমানে প্রভাবশালীরা প্রায় ১৩ হাজার একর বনভূমি জবরদখল করে রেখেছে মর্মে একটি প্রতিবেদন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংগ্রাহকের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। বাস্তবে এর পরিমাণ ২০ হাজার একর ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধিকাংশ জমিই বেদখল হয়েছে স্বাধীনতার পর। আবার ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়েও অনেকে আশ্রয় নিয়ে বন বিভাগের জমি দখল করে রেখেছেন। এসব জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ এবং ফলের বাগান ও অন্যান্য গাছ লাগিয়ে নিজেদের দখলে রেখেছেন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ।
-
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে আরও বেশি, প্রায় ৭,৫৯২ একর জমি দখলে রয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক ভূমি সমস্যায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল উদ্ধারে তৎপরতা কম হওয়ায় এই বেদখল প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।
-
এই প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি সার্কেলের বন সংরক্ষক মো. আব্দুল আউয়াল সরকার (সিএফ) প্রতিবেদককে বলেন, এ অঞ্চলে বহু পূর্ব থেকেই প্রায় ১৬,০৫৭.৪৮ একর বনভূমি জবরদখল হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৭২.৬১ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। অবশিষ্ট বনভূমি উদ্ধারের জন্য উচ্ছেদ প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মাঠপর্যায়ের কাজে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা সত্ত্বেও বন বিভাগ বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কাজ করে যাচ্ছে। #