শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের ভুমিকা: রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের বহুমাত্রিক দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ

  • প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৩:৪৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৫ মাস আগে
  গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পেছনে এক গভীর ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও সামাজিক চুক্তি নিহিত রয়েছে। এটি কেবল একটি তথ্য পরিবেশনকারী সংস্থা নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের বিবেক, প্রহরী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, জনসাধারণের ক্ষমতায়নের উৎস। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সুরক্ষিত মানবাধিকার পরিবেশের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে, যেখানে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, সেখানে গণমাধ্যমের আপোসহীন ভূমিকা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই কলামে গণমাধ্যমের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি বিশ্লেষণ করে এবং শিক্ষাবিদ, নীতি নির্ধারক ও সাধারণ জনগণের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর কার্যকারিতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হল।
(ক)গণতন্ত্রের ভিত্তি ও গণমাধ্যম:-শিক্ষাবিদরা গণমাধ্যমের ভূমিকাকে তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মতে, গণমাধ্যম মূলত বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ দ্বারা স্বীকৃত বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। যেখানে একই জায়গায় ৩৯ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশে যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে তার ভেতর থেকেই ডিজিটাল আইনের জন্ম হয়েছে। যে কারণে ৩৯ অনুচ্ছেদের এই দ্বিতীয় অংশটি সংশোধিত হওয়া উচিত অথবা সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ সবারই এ বিষয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার।গনমাধ্যম কেবল পেশাগত অধিকার নয়, বরং এটি জনগণের ‘জানার অধিকারকে’ (Right to Know) সুরক্ষিত করে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার (UDHR) ১৯ অনুচ্ছেদ এবং আইসিসিপিআর (ICCPR) এর ১৯ অনুচ্ছেদ দ্বারা স্বীকৃত। শিক্ষাবিদরা জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। এই ভূমিকা পালনের মাধ্যমে গণমাধ্যম ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা রোধ করে এবং সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
​নীতি নির্ধারকরা এই তাত্ত্বিক ভূমিকাকে বাস্তবে রূপ দিতে আইনি কাঠামো তৈরি করেন। তাঁদের প্রণীত তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (RTI Act) গণমাধ্যমের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সরকারি তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। এই আইন কেবল তথ্য পাওয়ার নয়, বরং সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এই আইনি সুযোগ ব্যবহার করে সরকারি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বৃহৎ প্রকল্পের অর্থ অপচয়ের খবর উন্মোচন করে। গণতন্ত্রে গণমাধ্যম এজেন্ডা-সেটিং এবং জনমত গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক বিতর্কের জন্য গণমাধ্যমকে অবশ্যই বহুমুখী মতামত (Pluralism) প্রতিফলিত করতে হবে এবং নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের তথ্য ও নীতিগত বিশ্লেষণ প্রদান করে ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে হবে।
​(খ)মানবাধিকার সুরক্ষা:-সাধারণ জনগণের কাছে গণমাধ্যম হলো তাদের সমস্যা ও অভিযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক মাধ্যম। গণমাধ্যম যখন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন বা নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার খবর নির্ভয়ে প্রকাশ করে, তখন তা কেবল খবর থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ন্যায়বিচারের জন্য একটি আইনি দলিল। এই ধরনের সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ‘ট্রমা-ইনফর্মড রিপোর্টিং’ (Trauma-Informed Reporting)-এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মর্যাদা এবং মানসিক আঘাতের প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের মানবাধিকারের বিষয়টি জনসমক্ষে এনে সামাজিক ও আইনি সংস্কারের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে সাধারণ জনগণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
​নীতি নির্ধারকদের সামনে গণমাধ্যম মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল থাকার দাবি উত্থাপন করে। গণমাধ্যম সামাজিক অ্যাডভোকেসি ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসিড সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহ বা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষের দুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো জাতীয় নীতি নির্ধারণী আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসে এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে, সাধারণ জনগণ অনেক সময় গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব এবং অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপের কারণে বস্তুনিষ্ঠতা হারানোর বিষয় নিয়ে হতাশ হন। তাঁদের কাছে গণমাধ্যমের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে জনগণের আস্থা এবং সহজে তথ্য পাওয়ার নিশ্চয়তার ওপর।
​(গ)গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও চ্যালেঞ্জ: গণমাধ্যমের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পথে দেশে ও বিদেশে অসংখ্য কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা সৃষ্টি হয় কিছু বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে, যা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করে। সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ (পূর্ববর্তী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮) এর মতো আইনের কিছু ধারা, বিশেষ করে মানহানি বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা সম্পর্কিত বিধানগুলো, সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।
​শিক্ষাবিদরা এই ধরনের আইনকে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তাঁরা ব্যাখ্যা করেন যে এই আইনি বাধ্যবাধকতা সাংবাদিকদের মধ্যে স্ব-সেন্সরশিপকে (Self-Censorship) উৎসাহিত করে। যখন সাংবাদিকরা মামলার বা হয়রানির ভয়ে সংবেদনশীল খবর চেপে যান, তখন জনগণের জানার অধিকার গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয় এবং সরকারের জবাবদিহিতা হ্রাস পায়।
​অন্যদিকে, নীতি নির্ধারকদের মধ্যে এক অংশ এই আইনগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ দমনের জন্য প্রয়োজনীয় বলে যুক্তি দেন। তবে, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
​এছাড়াও, মালিকানা কাঠামো গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতার জন্য একটি বড় হুমকি। রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা চলে গেলে, তারা তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবাদ কক্ষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এটিকে এক ধরনের ‘পেমেন্ট ফর কভারেজ’ বা প্রচ্ছন্ন দুর্নীতি বলা যেতে পারে। ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর (Fake News) এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার (Disinformation)-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই পরিস্থিতিতে, ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়াকে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি করা এবং উচ্চতর পেশাদার মান বজায় রাখা অপরিহার্য।
​(ঘ)ভবিষ্যতের পথরেখা ও সম্মিলিত অঙ্গীকার:-
​এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণমাধ্যমকে তার ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হলে সম্মিলিত কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। নীতি নির্ধারকদের উচিত সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি এবং মিথ্যা মামলা থেকে সুরক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সাংবাদিক সুরক্ষা আইন অবিলম্বে প্রণয়ন করা। এই আইনি কাঠামো সাংবাদিকদের নির্ভয়ে কাজ করার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।শিক্ষাবিদদের দায়িত্ব হলো সাংবাদিকতার উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং সাংবাদিকদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ অপরিহার্য করে তোলা, যাতে তারা সাইবার হামলার শিকার না হন এবং ডেটা জার্নালিজমের মাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মান উন্নত করতে পারে।
​সাধারণ জনগণের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমকে অবশ্যই জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে কমিউনিটি রিপোর্টিং ও স্থানীয় সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে হবে। জনগণের আস্থা এবং স্বতন্ত্র গণমাধ্যমের পক্ষে তাদের সংহতি হলো স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় রক্ষা কবচ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজের সংহতি প্রয়োজন। বিতর্কিত আইনগুলোর সংস্কারের জন্য সম্মিলিতভাবে চাপ সৃষ্টি করাও একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।চূড়ান্তভাবে বলা যায়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মুক্ত গণমাধ্যম—এই তিনটি শক্তি একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গণমাধ্যমকে শুধু সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করলে চলবে না, বরং তাকে সমাজের বিবেক হিসেবেও কাজ করতে হবে। নীতি নির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের এই চতুর্থ স্তম্ভকে মজবুত রাখা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই পারে একটি জাতিকে ক্রমাগত প্রশ্ন করতে, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং প্রতিটি নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখতে।# লেখক: সাংবাদিক  সফিউল আজম চৌধুরী

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...