শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলা: জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা, প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ, এবং সামাজিক পুনর্গঠনের এক সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা

  • প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৪:১৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৫ মাস আগে

ভূমিকম্প প্রকৃতির এক ভয়ংকর শক্তি, যা পূর্বাভাসহীনভাবে আঘাত হেনে মানব সভ্যতাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে ছয়জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এই দুর্যোগের তাৎক্ষণিক এবং ভয়াবহ ঝুঁকির এক নির্মম স্মারক। এই ধরনের ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলা কেবল ক্ষণস্থায়ী ত্রাণ বা ধ্বংসের ক্ষয়ক্ষতি কমানো নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী, বহু-স্তরীয় কৌশল, যা জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। এই মোকাবিলা কৌশলটি চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল: দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত প্রতিরোধ, উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক প্রস্তুতি, কার্যকর তাৎক্ষণিক সাড়াদান এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। এই প্রতিটি স্তরে সরকার, বিশেষজ্ঞ মহল, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
​ভূমিকম্পের বিরুদ্ধে সুরক্ষার প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর রেখা হলো প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো প্রতিটি নির্মাণে কঠোরভাবে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা এবং ভূমিকম্প-সহনশীল নকশার ব্যবহার নিশ্চিত করা। সরকারকে অবশ্যই বিল্ডিং কোডের মানদণ্ডকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর শাস্তির বিধান চালু করতে হবে। স্থাপত্য প্রকৌশলে এখন এমন কৌশল ব্যবহৃত হয়, যা ভবনের ভিত্তি থেকে শুরু করে কাঠামো পর্যন্ত কম্পনের শক্তিকে শোষণ করে নিতে পারে। এই কৌশলগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘বেস আইসোলেশন’ প্রযুক্তি, যেখানে ভবনকে ভিত্তি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাবার বা স্প্রিং জাতীয় শক শোষণকারী উপকরণ স্থাপন করা হয়। এটি ভবনটিকে মাটির নিচে ভূমিকম্পের কম্পন থেকে অনেকাংশে মুক্ত রেখে সুরক্ষা দেয়। এছাড়াও, ‘স্ট্রাকচারাল ড্যাম্পার’ ব্যবহার করা হয়, যা কাঠামোর মধ্যে কম্পনের শক্তিকে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং ভবনের দোলন সীমিত করে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করে। বিশেষ করে, উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাতাসের ওজনের সঙ্গে ড্যাম্পারের ব্যবহার একটি অত্যাবশ্যকীয় কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
​শুধু নতুন নির্মাণ নয়, পুরাতন ও দুর্বল ভবনগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘রেট্রোফিটিং’ বা মানোন্নয়ন প্রক্রিয়া অপরিহার্য। এই রেট্রোফিটিং প্রক্রিয়াকে আরও সহজলভ্য করতে এবং এটি বাধ্যতামূলক করতে সরকারি ভর্তুকি বা দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে, ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলির স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখে আধুনিক প্রতিরোধক প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার বিশেষ প্রকৌশলী দল থাকা আবশ্যক। অবকাঠামোগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস ও জল সরবরাহ কেন্দ্র এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোগুলিকে সর্বোচ্চ স্থিতিস্থাপকতার মানদণ্ডে তৈরি করা আবশ্যক, যাতে দুর্যোগের পরেও এই জীবন রক্ষাকারী পরিষেবাগুলি সচল থাকে। গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ প্রক্রিয়া বা ফাস্ট-রেসপন্স মেকানিজম যুক্ত করা উচিত, যা কম্পন শুরু হওয়ার সাথে সাথে সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড ও শর্ট-সার্কিটের ঝুঁকি হ্রাস করবে। এর পাশাপাশি, জরুরি নির্গমন পথের পর্যাপ্ত প্রশস্ততা এবং অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনাগুলিতে নিয়মিত স্ট্রাকচারাল অডিট পরিচালনা করা জরুরি, যাতে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো শুরুতেই চিহ্নিত করা যায়।
​এই প্রযুক্তিগত প্রতিরোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে ঝুঁকি স্থানান্তর এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা। ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট বিপুল আর্থিক ক্ষতি এককভাবে মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। তাই, ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ভূমিকম্প বীমা ব্যবস্থার প্রচলন ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা জরুরি, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সরকারকে এই বীমা পলিসিগুলোকে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করার জন্য বিশেষ কর ছাড় বা প্রণোদনা দিতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে একটি দুর্যোগ ঝুঁকি পুল বা তহবিল গঠন করা অত্যাবশ্যক, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করবে এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘ক্যাটাষ্ট্রফি বন্ড’ বা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুঁকি স্থানান্তর করা যেতে পারে। এই আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করা জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য, কারণ আর্থিক পুনরুদ্ধার যত দ্রুত হবে, তত দ্রুত সমাজ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো সম্ভব হবে।
​দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় প্রস্তুতি হলো কার্যকর সাড়াদানের ভিত্তি। সরকারের উচিত একটি সুসংগঠিত জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান কাঠামো তৈরি করা, যেখানে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান বাহিনী, দমকল, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকবে। নিয়মিতভাবে সকল স্তরে আন্তঃ-সংস্থা প্রশিক্ষণ এবং মহড়ার আয়োজন করা উচিত, যাতে দুর্যোগের সময় সমন্বিতভাবে কাজ করা যায় এবং ক্ষমতার বিভাজন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে। শহরাঞ্চলে ঘনবসতি এবং সরু রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়; তাই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’দের প্রশিক্ষিত করে তোলা দরকার, যারা পেশাদার বাহিনী পৌঁছানোর আগে প্রাথমিক অনুসন্ধান, উদ্ধারকাজ ও প্রাথমিক চিকিৎসা পরিচালনা করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্রায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। নরম মাটি বা ভূমিধসের প্রবণতাযুক্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি নির্মাণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে জনগণকে সচেতন করা সরকারের দায়িত্ব। এছাড়াও, ভূমিকম্পের প্রারম্ভিক সতর্কতা ব্যবস্থা স্থাপনের গবেষণা ও বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কম্পনের প্রথম ধাপ অনুভূত হওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ডের মূল্যবান সময় দিতে পারে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন থামানো বা গ্যাস শাট-অফ করার জন্য যথেষ্ট। এই সতর্কতা ব্যবস্থার বার্তা যেন দ্রুত এবং কার্যকরভাবে জনসাধারণের কাছে পৌঁছায়, সেই জন্য বিভিন্ন চ্যানেলে (যেমন: মোবাইল অ্যাপ, রেডিও, সাইরেন) সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।বিশেষভাবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্প মহড়ার আয়োজন করতে হবে। সকল শিক্ষক ও কর্মচারীকে ‘ডাক, কাভার ও হোল্ড অন’ কৌশল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিশুদের জন্য মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশে দুর্যোগকালীন করণীয় সম্পর্কে শিক্ষাদান জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি সুনির্দিষ্ট জরুরি বহির্গমন পরিকল্পনা এবং জরুরি সরবরাহ কিট থাকা আবশ্যক।তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রস্তুতি হলো জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ। প্রতিটি পরিবারকে অবশ্যই কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, পানীয় জল, রেডিও, ফ্ল্যাশলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, গুরুত্বপূর্ণ ঔষধপত্র, হুইসেল এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ফটোকপি সমন্বিত একটি জরুরি কিট প্রস্তুত রাখতে হবে। পারিবারিক জরুরি পরিকল্পনায় বাড়ির ভেতরে ও বাইরে নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্ধারণের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ বন্ধ করার প্রক্রিয়া প্রতিটি সদস্যের জানা থাকা অত্যাবশ্যক। শিশুদের জন্য আতঙ্ক মোকাবেলার কৌশল এবং পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। নিয়মিতভাবে ‘ড্রপ, কাভার এবং হোল্ড অন’ কৌশলটির মহড়া দেওয়া হলে তা জরুরি মুহূর্তে আতঙ্ক কমিয়ে এনে দ্রুত আত্মরক্ষার দক্ষতা বাড়ায়। সরকার জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে এই ব্যক্তিগত প্রস্তুতির গুরুত্ব তুলে ধরবে।কম্পন শুরু হওয়ার মুহূর্ত হলো তাৎক্ষণিক সাড়াদানের সময়। এই সময় আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জীবন বাঁচাতে পারে। বাড়ির ভেতরে থাকলে দ্রুত মেঝেতে বসে শক্ত টেবিল বা ডেস্কেট নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত সেটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকতে হবে। বাইরে থাকলে দ্রুত খোলা স্থানে যাওয়া এবং ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গ্যাস ট্যাঙ্ক বা ল্যাম্পপোস্ট থেকে দূরে থাকা নিরাপদ।ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পরেও বিপদ সম্পূর্ণ দূর হয় না, এই সময় শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মোকাবিলার পর্ব। আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে, গুরুতর রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রথম অগ্রাধিকার। রক্তক্ষরণের স্থানে সরাসরি পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে রক্তক্ষরণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হাড় ভাঙা সন্দেহ হলে আঘাতপ্রাপ্ত অঙ্গটিকে একেবারেই নাড়াচাড়া না করে কাঠ বা শক্ত উপকরণ ব্যবহার করে আলতোভাবে স্প্লিন্ট তৈরি করে স্থির রাখা আবশ্যক। আঘাত বা তীব্র মানসিক চাপের কারণে সৃষ্ট শক-এর মোকাবিলা করা জরুরি; রোগীকে শুইয়ে দিয়ে পা সামান্য উঁচুতে রাখতে হবে এবং শরীর উষ্ণ রাখার জন্য কম্বল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ছোটখাটো আঘাতগুলো দ্রুত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করা উচিত যাতে সংক্রমণ না হয়। মনে রাখতে হবে, এই প্রাথমিক চিকিৎসা কেবল পেশাদার সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত আহত ব্যক্তির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য।
​যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এই দুর্যোগের একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। নেটওয়ার্ক ওভারলোডের কারণে ফোন কল এড়িয়ে টেক্সট মেসেজ বা ইন্টারনেটভিত্তিক মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত। যদি সেলুলার নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে যায়, তবে পূর্বনির্ধারিত মিলনস্থলে পৌঁছানো এবং ব্যাটারি-চালিত রেডিওর মাধ্যমে জরুরি সতর্কতা ও তথ্য শোনা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় এই সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; দ্রুত উদ্ধারকারী দল, বিশেষজ্ঞ এবং ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের জন্য জাতীয় নীতিমালার প্রস্তুতি থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার সময় যেন ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়, সেই জন্য প্রশিক্ষিত স্থানীয় সমন্বয়কারী থাকা দরকার। সরকার এই সময়ে জনগণের মধ্যে মানসিক চাপ ও আতঙ্ক কমাতে রেডিও, টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য এবং শান্তিমূলক বার্তা প্রচার করতে পারে। গুজব ও ভুয়া তথ্য কঠোরভাবে দমন করা এবং কেবল সরকারি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সরবরাহ করা মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য জরুরি।
​চতুর্থত, পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ভূমিকম্প মোকাবিলা প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদী ধাপ। এই পর্যায়ে সরকার এবং জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় কেবল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ নয়, বরং মানুষের জীবিকা ও সামাজিক কাঠামোর পুনরুদ্ধারও অন্তর্ভুক্ত। এই ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ভূমিধস, রাসায়নিক ও বিষাক্ত বর্জ্যের নির্গমন এবং পানীয় জলের উৎসের দূষণ দ্রুত চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা সরকারের দায়িত্ব। পরিবেশ সুরক্ষার মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ এবং পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
​এছাড়াও, কমিউনিটি স্থিতিস্থাপকতা মডেল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় কমিউনিটিগুলোকে স্ব-নির্ভরশীল করে তোলার জন্য প্রতিবেশীদের নিয়ে গঠিত ‘নেবারহুড ওয়াচ প্রোগ্রাম’ তৈরি করা যেতে পারে, যারা প্রথম ৭২ ঘণ্টা পেশাদার সাহায্য পৌঁছানোর আগে নিজেরাই প্রাথমিক অনুসন্ধান, উদ্ধারকাজ এবং পারস্পরিক সহায়তা নিশ্চিত করবে। এই কমিউনিটি মডেল সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে এবং দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সহায়ক হয়।
​আইনগত ও শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে, সরকারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট আইন ও রেগুলেশনের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে এবং সেই আইনগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্যোগকালীন জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার, সম্পদ অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইনগুলি যেন স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করা আবশ্যক, যাতে তারা দ্রুত ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে। অবকাঠামো এবং জীবনযাত্রার পুনর্গঠনের সময় যেন কঠোরভাবে ভূমিকম্প-সহনশীলতার মানদণ্ড বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা উচিত। এই ঝুঁকি মোকাবিলা কেবল একটি আইন বা নীতির বাস্তবায়ন নয়; এটি জনগণের মধ্যে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সম্মিলিত মানসিকতা গড়ে তোলার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। প্রস্তুতিই এই বিপর্যয় থেকে মানবতাকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়।লেখক:-সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...