মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬

রাঙামাটিতে  (এমএন লারমা) ৪২ তম  শোকদিবস পালন

  • প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৭ মাস আগে
 জেলা প্রতিনিধি:- শোক র‌্যালি ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্যদিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র (এমএন লারমা) ৪২ তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জুম্ম জাতীয় শোক দিবস পালন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সোমবার সকালে রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এই স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি গঙ্গা মানিক চাকমার সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাকমা। স্মরণসভায় প্রধান অতিথি শিশির চাকমা বলেন, জুম্ম জনগনের মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪২ বছর। কিন্তু অল্প সময়ে তিনি এক বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারি ছিলেন। তিনি মাত্র ৩২ বছর বয়সে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই অল্প বয়সেই তিনি দেখেছেন জুম্ম জনগণের দুঃখ দূর্দশা ও অধিকার হারানোর চিত্র। মানুষ হিসেবে তিনি বিনয়ী, মানবতাবাদী ও মহানুভব চিত্তের অধিকারী ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, বিভাজনের রাজনীতি আমাদের শেষ করে দিয়েছে। আমাদের স্বপ্নগুলো গলাটিপে হত্যা করছে। মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত। আমরা এখন চারটি পাঁচটি দলে বিভাজিত, হয়তো সামনে আরও হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম কিন্তু এসব বিষয়ে একদিন প্রশ্ন তুলবে। আজকে যারা আমাদের পার্বত্য অঞ্চলকে একটি সাপদ সংকুল অরণ্য তৈরী করে রেখেছেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবন চারণ, প্রান্তিক মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস এবং আমরা যে সংস্কৃতি যুগযুগ ধরে লালন করছি আজ তা আস্থার সংকটে ঝড়ে পড়ছে। এর দায় একদিন নিতে হবে।
স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন, আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য ও জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা, আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য অঞ্চলের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি এ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি সুমন চাকমা। স্মরণ সভায় বক্তারা বলেন, এমএন লারমা আমাদের একমাত্র শক্তি। তিনি দেখিয়ে গেছেন কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে থাকতে হবে। তার জীবন যদি আমরা পাঠ করি, তার জীবন দর্শন যদি আমরা দেখি তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ সংগ্রাম লড়াই আন্দোলন এগুলো থেকে পিছুহটা যাবেনা। যতক্ষন পর্যন্ত আমরা আদিবাসী হিসেবে স্মীকৃতি না পাবো ততক্ষন পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এবং এই পার্বত্য চুক্তিও বাস্তবায়ন করতে হবে। স্মরণসভায় আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কে এস মং মারমা, মাধবীলতা চাকমাসহ জনসংহতি সমিতির সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ এবং যুব সমিতি, মহিলা সমিতি ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
  প্রসঙ্গত: রাঙামাটির মহাপুরম গ্রামে এম এন লারমা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালে, আর তাঁর ছোট ভাই সন্তু লারমা ১৯৪৪ সালে। এম এন লারমা ১৯৫৬ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পা দেন। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনে তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে হাজারও মানুষের বাস্তুচ্যুতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি ১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ১৯৬৩ সালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নিবর্তনমূলক আইনে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৫ সালে তিনি আবার কারাগার থেকে মুক্ত হন। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি এক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে লারমা ভ্রাতৃদ্বয়ের আন্দোলন তাঁদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিণত করে। এম এন লারমা ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে চার দফাসংবলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামা পেশ করেন।

১৯৭২ সালে যখন সংবিধান সব নাগরিককে ‘বাঙালি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অস্বীকার করে, তখন এম এন লারমা এর প্রতিবাদস্বরূপ গণপরিষদ থেকে ওয়াকআউট করেন। বাংলাদেশ গণপরিষদ বিতর্কের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।…কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা চৌদ্দপুরুষ—কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা দশটি ছোট ছোট জাতি বাস করি। চাকমা, মগ (মারমা), ত্রিপুরা, লুসাই, বোম, পাংখো, খুমি, খিয়াং, মুরং ও চাক—এই দশ ছোট ছোট জাতি সবাই মিলে আমরা নিজেদের “পাহাড়ি” বা “জুম্ম জাতি” বলি।’

এম এন লারমা শুধু পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারের কথাই বলেননি। গণপরিষদ বিতর্কের সময় তিনি দেশের মাঝিমাল্লা, জেলে, প্রান্তিক কৃষক, রিকশাচালক, কলকারখানার শ্রমিক, নারী থেকে শুরু করে সব প্রান্তিকের মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন এবং সংবিধানে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে তিনি পাহাড়ের রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময় তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি জনসংহতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পাহাড়ের জাতিসত্তাগুলোর আন্দোলনে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ধারণা যুক্ত করেন, যা ছিল বিশ্বব্যাপী খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংগ্রামের একটি দার্শনিক ভিত্তি।

তিনি পাহাড়ে আদিবাসী সমাজে শ্রেণি বিশ্লেষণের দ্বারা রাজনৈতিক রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করেছিলেন, যাতে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শত্রু–মিত্র চিহ্নিত করা যায়। ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাঁকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়। ১৯৭৭ ও ১৯৮২ সালের জাতীয় সম্মেলনে তিনি জনসংহতি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর তিনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে নিহত হন, কিন্তু মৃত্যু হলেও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ অমরত্ব পেয়ে যায়।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...