মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬

বৈষম্যের পর্দার আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যুগে যুগে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি

  • প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৫, ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১ বছর আগে

বিশেষ প্রতিবেদক:-   বৈষম্যের পর্দার আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যুগে যুগে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ যখন নিজেদের স্বার্থে অন্যদের বঞ্চিত করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটাই কি ন্যায়বিচার? “যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ”—এই প্রবচন যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অনুদান বণ্টনের চিত্র সেই চিরায়ত বৈষম্যেরই প্রতিচ্ছবি।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার থেকে মোট ৩,১২,৫০,০০০ (তিন কোটি বারো লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই অনুদানের বণ্টন ছিল একেবারেই বৈষম্যমূলক। চাকমা সম্প্রদায়ের ৯৬ জন, মারমাদের ৪০ জন, বাঙালিদের ৩৬ জন এবং ত্রিপুরাদের মাত্র ৭ জন এই বরাদ্দের আওতায় এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা একসময় বলেছিলেন, “আমরা পিছিয়ে পড়া জাতি নই, আমাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে।” কিন্তু তিনিই কি না আজ দায়িত্বে থেকে কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে বাকিদের পিছিয়ে রাখলেন! যখন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের উপর নয়, বরং পুরো পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতির উপর প্রভাব ফেলে। অনুদানের টাকা প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছে না গিয়ে, কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এমনকি সদ্য গড়ে ওঠা কিছু সংগঠন, ক্লাব, কিংবা নামমাত্র সমিতির নামে অর্থ বরাদ্দের তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো সহায়তা পাননি।

এই ধরনের বরাদ্দ ব্যবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—অনুদানের প্রকৃত লক্ষ্য কি জনগণের কল্যাণ, নাকি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করা? বিষয়টি শুধু একটি সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচার নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। বারবার যদি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় উন্নয়ন ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি জন্ম নেয়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক বিভেদের কারণ হতে পারে। রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে উন্নয়ন ও সহায়তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে উপকৃত হয়। কিছু যুক্তি দেওয়া হয় যে, অনুদানের মাধ্যমে নেওয়া প্রকল্পগুলো সবাইকে উপকৃত করবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ব্রিজ বা অবকাঠামো নির্মাণ হলে তা সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকল্প গ্রহণের সময় যদি পক্ষপাত করা হয়, তবে সেই প্রকল্পের সুফলও পক্ষপাতমূলক হয়ে যায়। যখন বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকা দেখলে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে প্রায় উপেক্ষা করা হয়, তখন স্পষ্ট হয় যে, এটি নিছক অবহেলা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত বৈষম্য। এই অর্থ বরাদ্দের পেছনে যে অনৈতিক কর্মকাণ্ড লুকিয়ে আছে, তা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। নামমাত্র প্রকল্প তৈরি করে, অতি গোপনীয়তার সঙ্গে, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করা হয়েছে। অথচ, এই অর্থ যদি সমানভাবে বিতরণ করা হতো, তবে পার্বত্য এলাকার সব সম্প্রদায়ের মানুষই উপকৃত হতো। এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যুগে যুগে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করলে বৈষম্যের শিকল কখনো ভাঙে না। আজ যারা ক্ষমতায় থেকে বৈষম্যের রাজনীতি করছে, কাল তাদেরকেও জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

আমরা এই বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। রাষ্ট্রীয় অর্থ কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি সকল জনগণের। তাই অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বিনষ্ট হবে, সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিভেদ বাড়বে, যা কারোরই কাম্য নয়। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায়, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ চলতেই থাকবে, আর ত্রিপুরা সম্প্রদায়সহ আরও অনেকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এটি শুধুমাত্র ত্রিপুরাদের সমস্যা নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আর ন্যায়বিচার কোনো একক গোষ্ঠীর সম্পদ নয়, এটি সকলের অধিকার। #

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...