শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

পথশিশু: এক বিচ্ছিন্ন জনপদের করুণ আর্তি—রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও মানবিক অঙ্গীকার

  • প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ৫:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৫ মাস আগে

এম,সফিউল আজম চৌধুরী :-বাংলাদেশের নগর, বন্দর, এবং প্রান্তিক জনপদের বুকে পথশিশুরা এক নির্মম সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তারা কেবল দারিদ্র্যের শিকার নয়;তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোর ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা এক চরম বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। ইউনিসেফ (UNICEF)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে আনুমানিক এক মিলিয়নেরও বেশি পথশিশু চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। এই বিশাল সংখ্যক শিশু যখন জীবনধারণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তা কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এক তীব্র অভিযোগ। এই চরম প্রান্তিকতার বিষয়টি সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত—যেখানে তাদের ‘নাগরিক অধিকার বঞ্চিত সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন এক জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ​পথশিশুদের এই সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হলো, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অভিবাসন । নদীভাঙন, বন্যা বা কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসা পরিবারগুলো যখন আশ্রয়হীন হয়, তখন তাদের শিশুরা সহজেই পথের জীবনে প্রবেশ করে। এই শিশুরা কেবল পথে ঘুমায় না; তাদের অধিকাংশই শ্রমজীবী শিশু —আবর্জনা কুড়ানো, হকারি করা বা কুলিগিরির মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে তারা নিয়োজিত। ​আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং দেশের সংবিধান এই শিশুদের সুরক্ষার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এর অনুচ্ছেদ ৬ ও ১৯ অনুযায়ী শিশুর বেঁচে থাকা ও শোষণের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ইউনিসেফ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে যে, পথশিশুদের অধিকাংশ (৮০ শতাংশের বেশি) শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয় এবং এদের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা পায়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এই শিশুদের মৌলিক সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (মৌলিক জীবনোপকরণ) এবং অনুচ্ছেদ ১৭ (শিক্ষার অধিকার)-এর সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ পথশিশুর নিরক্ষরতা ও আশ্রয়হীনতা সংবিধানের মৌলিক ধারাগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন। এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) অনুযায়ী বিশেষ বিধান প্রণয়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, প্রায় ৫৮ শতাংশ পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন আজও নিশ্চিত করা যায়নি, যা তাদের সব ধরনের সরকারি সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ​আইনি কাঠামোর ব্যর্থতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় সংগঠিত অপরাধ সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রে। পথশিশুদের মাদকাসক্তি, ভিক্ষাবৃত্তি এবং পাচার প্রায়শই শক্তিশালী চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৭১০ জন পথশিশুর তালিকা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নাগরিক সমাজ এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ দাবি করছে। এই চক্রগুলো শিশুদের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা ও যৌন শোষণে নিয়োজিত করে। শিশু আইন-২০১৩-এর কঠোর বিধান থাকা সত্ত্বেও, এই সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপের অভাব রয়েছে, যা পথশিশুদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ​এছাড়াও, কিশোর বিচার ব্যবস্থা পথশিশুদের জন্য প্রায়শই কাজ করে না। ইউনিসেফ বাংলাদেশে শিশু আইন-২০১৩ এর বাস্তবায়নে সহায়তা করলেও, অনেক সময় পথশিশুদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের প্রতি পুনর্বাসনমূলক পদ্ধতির পরিবর্তে দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করা হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর (DSS) পরিচালিত শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার অভাব, অমানবিক পরিবেশ এবং অপ্রতুল প্রশিক্ষণের কারণে শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। ফলে শিশুরা সেই কেন্দ্রগুলো থেকে পালিয়ে এসে আবার পথের জীবনে ফিরে যায়, যা প্রমাণ করে যে, সরকারের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্নের মডেল কার্যকর নয়। ​পথশিশুদের প্রতি এই অবহেলা কেবল মানবিক ব্যর্থতা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের অভাবের কারণে এই শিশুরা অদক্ষ থাকে, যার ফলস্বরূপ দেশের জিডিপি (GDP) বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এই শিশুরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথে থাকে, তখন তারা আন্তঃপ্রজন্ম দারিদ্র্য চক্র সৃষ্টি করে। তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বিচার এবং পাবলিক স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। সুতরাং, পথশিশুদের পুনর্বাসন একটি সামাজিক সুরক্ষা নয়, এটি একটি জরুরি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। ​সরকারকে তার আইনি প্রতিশ্রুতিকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হলে কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। ইউনিসেফ-এর পরামর্শ এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে, সরকারকে জরুরিভিত্তিতে একটি ‘ন্যাশনাল স্ট্রিট চাইল্ড ডেটাবেইস’ তৈরি করতে হবে এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও এনজিও-র সমন্বয়ে জিরো-কস্ট প্রক্রিয়ায় জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। ​দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারের ভূমিকা বাড়াতে হবে। সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক ‘চাইল্ড-ফ্রেন্ডলি স্পেসেস (CFS)’ তৈরি করতে হবে। কেবল প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্নের মডেল বাদ দিয়ে কমিউনিটি-ভিত্তিক ‘ওপেন শেল্টার’ চালু করা উচিত। মাদকাসক্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত, মানবিক এবং বিনামূল্যে মাদকাসক্তি নিরাময় ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। ​তৃতীয়ত, শিক্ষা ও কাজের মডেলের সমন্বয় করতে হবে। যেহেতু অধিকাংশ পথশিশু শ্রমজীবী, তাই তাদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সময়সূচিকে নমনীয় করতে হবে, যাতে তারা দিনের কাজের ফাঁকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। বেসরকারি খাতকে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR) এর মাধ্যমে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে অর্থায়ন এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ​পথশিশুদের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে তাদের প্রতি মানবিক সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। স্থানীয় এনজিও, যুব সংগঠন এবং সমাজের বিত্তবানদের উচিত সরকারের সাথে সহযোগিতা করে পথশিশুদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া। ​ পথশিশুদের বঞ্চনা এবং বিচ্ছিন্নতা আমাদের রাষ্ট্রের আইনি এবং নৈতিক কাঠামোর দুর্বলতাকে উন্মোচন করে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সকলের সম্মিলিত অঙ্গীকারের ফল। সরকার যখন তার আইনি প্রতিশ্রুতিকে কাজে পরিণত করার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করবে, এবং নাগরিক সমাজ যখন তাদের প্রতি মানবিক হাত বাড়িয়ে দেবে, কেবল তখনই এই বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরে আসতে পারবে। পথশিশুদের প্রতি প্রতিটি পদক্ষেপই হওয়া উচিত বিচ্ছিন্নতা দূর করে জাতীয় সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ এবং মানবিক অঙ্গীকার।###লেখক :- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...