রাঙামাটি প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের দাবিতে আদিবাসীদের আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণসহ সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, আন্দোলন ছাড়া আদিবাসী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার রাঙামাটিতে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘ক’ অঞ্চল আয়োজিত “পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্ম জনগণের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা” শীর্ষক সুধী সমাবেশ ও মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সন্তু লারমা।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এখানে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সরকার প্রধানের শাসনক্ষমতা মূলত সমতলে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসনক্ষমতা অন্য একটি মহলের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। ফলে জুম্ম জনগণ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের ভবন লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনাগুলো গভীরভাবে ভাবার বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের নাগরিকরা দ্বিধাগ্রস্ত, তারা সাহস করে কথা বলতে পারছেন না। বিভিন্ন কারণে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না তারা।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা নিজেদের ও দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু নিজ জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তদুপরি, প্রথাগত নেতৃত্ব কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হেডম্যান ও কারবারিদের একটি অংশ নিজেদের স্বার্থে শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব কাজ করে। ফলে তারাও আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদাসীন।
সরকার প্রসঙ্গে সন্তু লারমা বলেন, দেশের সরকার প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নয়; বরং উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষক। এ কারণে তারা আদিবাসীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে সরকারের মূল ভয় হলো—একবার স্বীকৃতি দিলে জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসীদের জন্য নির্ধারিত অধিকারের প্রশ্ন চলে আসবে। তাই সরকার আদিবাসীদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দ থাকা বা না থাকা মূল বিষয় নয়; মূল দাবি হলো—অধিকার প্রতিষ্ঠা। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই আদিবাসীদের জাতীয় স্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষা পাবে। তাই জুম্ম জনগণসহ সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সকাল ১১টায় রাঙামাটি শহরের নিউ মার্কেটের আশিকা কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং মারমা, আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মধুমঙ্গল চাকমা, সদস্য নমিতা চাকমা, কবি ও সাহিত্যিক শিশির চাকমা, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক সম্পাদক থোয়াই অং মারমা, আদিবাসী ফোরামের বান্দরবান প্রতিনিধি অং সমং মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকদার।