বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কাশ্মিরে জঙ্গি হামলা নাকি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ!

  • প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০২৫, ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১ বছর আগে
দক্ষিণ কাশ্মিরের পেহেলগাম এলাকার বৈসারণ উপত্যকায় সংঘটিত এক মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন নিরীহ পর্যটক। এই ঘটনা যেমন কাশ্মিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তেমনি তুলে ধরেছে গভীর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও। ঘটনাটি এমন এক সময়ে সংঘটিত হলো যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত সফরে রয়েছেন। এই সময় নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক পরিবেশে এমন একটি নৃশংস হামলা নিছক কাকতালীয় বলে মনে হয় না। বরং অনেক বিষয় বিশ্লেষণ করলে এই হামলার পেছনে মোদি-অমিতদের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ ও গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হয় মত বিশ্লেষকদের।
নিহতদের অধিকাংশই ভারতীয় পর্যটক ছিলেন, যাদের মধ্যে দুজন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। একজন স্থানীয় মুসলিম যুবকও ছিলেন। হামলার পরপরই ভারতীয় গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানকে দায়ী করে প্রচার শুরু করে। যদিও এখনও পর্যন্ত হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি তারা। এনডিটিভি দ্য হিন্দুসহ অন্যান্য ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, এ ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। তবে এটাও একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ হতে পারে খবর দিয়েছে এআরওয়াই নিউজ। স্বল্প পরিচিত কাশ্মির রেজিন্ট্যান্সও হতাহতের পরপরই ফেসবুক পোস্টে দায় স্বীকার করে। খোদ ভারতীয়রাই পুরো ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পাঁয়তারা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, সরকার নিজেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামলাটি ঘটিয়ে পাকিস্তানকে দোষারোপ করেছে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশায়। তা ছাড়া এটি প্রথমবার নয় অতীতেও, বিশেষ করে ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর এই ধরনের সন্দেহ দানা বেঁধেছে। সে সময় কৌশলে হামলা ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দেওয়া হয় এবং নির্বাচনি সুবিধা আদায় করেছিল বিজেপি শিবির।
কাশ্মির এমন এক অঞ্চল যেখানে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। এই মাত্রার সামরিকীকরণ, সর্বোচ্চ প্রযুক্তির নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ এবং সেনাচৌকিগুলোতে তৎপরতার পরও কীভাবে কয়েকজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী পর্যটকদের কেন্দ্রবিন্দুতে এমন নারকীয় তাণ্ডব চালাতে পারল, সেটি এক বড় প্রশ্ন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে, সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা যেতেই পারে হামলাকারীরা কীভাবে এতটা গভীরে ঢুকল?
কাশ্মিরের ইতিহাসে পর্যটকরা কখনোই সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু হয়নি। স্থানীয় সামরিক কমান্ডারদের ভাষ্যমতে, ‘জঙ্গিরা পর্যটকদের আক্রমণ করে না। কাশ্মির বেঁচে থাকে ট্যুরিজমের ওপরে। ওদের টার্গেট আমরা (সেনাবাহিনী)।’ এই প্রথমবারের মতো পর্যটকদের ওপর এমন সুসংগঠিত হামলা ঘটানো হয়েছে, যা স্বাভাবিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধরন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা শিকারদের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে তবেই হত্যা করেছে। এই পদ্ধতি ইঙ্গিত দেয় যে হামলাটি শীর্ষ স্তর থেকে পরিকল্পিত ছিল এবং এর  পেছনে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য কাজ করেছে। কোনো জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে কাশ্মীরের পর্যটকদের টার্গেট করে হামলা করা একেবারেই বিরল। কাশ্মিরের অর্থনীতি অনেকাংশে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, এমনকি অতীতে জঙ্গি নেতারাও পর্যটকদের টার্গেট করা থেকে বিরত থাকার বার্তা দিয়েছেন। ফলে এবার হঠাৎ করে ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে পর্যটকদের হত্যা করার ঘটনা জঙ্গি কৌশলের থেকে অনেকটাই বিচ্যুত বরং এটা উদ্দেশ্যমূলক বিভাজন সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান।
তা ছাড়া এই হামলা ঘটেছে ঠিক তখনই যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত সফর করছিলেন এবং ভারতের অভ্যন্তরে ওয়াকফবিল আন্দোলন জোরালো হচ্ছিল। এমন সময় বেছে নেওয়া থেকে স্পষ্ট যে, হামলাকারীরা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য এই মুহূর্তটি বেছে নিয়েছে।
অন্যদিকে ঘটনার পরপরই ভারতীয় মিডিয়া ও সরকারপন্থি সামাজিকমাধ্যম পাকিস্তানকে দায়ী করার প্রচারণা শুরু করে। এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল বলে প্রতীয়মান হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল পরমাণু ইস্যুতে আমেরিকার সাম্প্রতিক মনোভাবকে প্রভাবিত করা এবং পাকিস্তানবিরোধী জনমত তৈরি করা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই হামলা সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা, বিশেষ করে কাশ্মির নীতি ও মুসলিম নাগরিকদের প্রতি দমন-পীড়নের বিষয়গুলোকে আড়াল করার একটি কৌশল হতে পারে।
গত কিছুদিন ধরে ওয়াকফ আইন নিয়ে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারকে চাপা দিতেই এই হামলার ঘটনা ব্যবহার করা হতে পারে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সফরকালে এই হামলা ঘটানোর মাধ্যমে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও বেশি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
সন্ত্রাসী হামলায় বেঁচে ফেরা তরুণ দত্ত নামে এক পর্যটক বলেছেন, কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পেহেলগ্রাম থেকে জম্মু ফিরেছি। গোটা কাশ্মিরে ২০ মিটার অন্তর আর্মি ছিল, কিন্তু পেহেলগ্রামে তো একজনও আর্মি ছিল না। পরিকল্পিত ঘটনা। তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য নামে এক ভারতীয় বিশেষজ্ঞ তরুণ দত্তের কথার পিঠে বলেছেন, যিনি প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন তিনিও বলছেন এটা পরিকল্পিত ঘটনা। (মোদির)  ভক্তরা হয়তো বলবে এসব ফেক, কিন্তু এর দায় কে নেবে? কার নেওয়ার কথা?
পেহেলগ্রাম, গুলমার্গ ও শোনমার্গের মতো পর্যটন এলাকাগুলো সর্বদা সেনাবাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসীদের এই এলাকায় প্রবেশ ও বড় আকারের হামলা চালানো অত্যন্ত কঠিন। এই ব্যর্থতা ইঙ্গিত দেয় যে হয় সরকার এই হামলাকে বাধা দিতে ইচ্ছুক ছিল না, অথবা এটি তাদের জ্ঞাতসারেই ঘটতে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছিলেন যে তিনি জঙ্গি হামলা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু এই হামলা সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যদি পাকিস্তান থেকে জঙ্গি প্রবেশ সম্ভব হয়, তা হলে মোদি সরকার কেন তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে? আর যদি তা সম্ভব না হয়, তা হলে এই হামলাকারীরা কীভাবে কাশ্মিরে প্রবেশ করল?
একজন ভুক্তভোগী পল্লবীর বিবরণে কিছু অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়ে। তিনি দাবি করেছেন যে তার স্বামীকে হত্যার পর হামলাকারী তাকে বলেছে, ‘তোমাদের মারব না। যাও, মোদিকে জানাও গিয়ে (এখানে কী হয়েছে)।’ এই ধরনের বিবৃতি থেকে সন্দেহ জাগে যে, হামলাটি একটি মহল থেকে সমর্থন পেয়েছে।
এই হামলা কাশ্মির ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরুজ্জীবিত করেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির কাশ্মিরকে ইসলামাবাদের ‘জাগুলার ভেইন’ (জীবনরেখা) বলে উল্লেখ করেছেন, যা এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরে। অন্যদিকে ভারত সরকার এই হামলাকে কাজে লাগিয়ে কাশ্মিরে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করতে পারে।
ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলার মাধ্যমে সরকার একাধিক উপায়ে লাভবান হতে পারে। যেমন পাকিস্তানকে দোষারোপ করে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি। কাশ্মিরি মুসলিমদের দমন-পীড়নের যৌক্তিকতা তৈরি। ওয়াকফবিল ও মুসলিম নিধন আন্দোলন থেকে মনোযোগ সরানো। নির্বাচনি প্রচারে জাতীয়তাবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী শক্তিশালী বার্তা উপস্থাপন। মার্কিন, রাশিয়ান ও ইসরাইলি নেতাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং মোদির সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার ঘটনা এই আশঙ্কাকেই জোরদার করে।
কাশ্মিরের এই সন্ত্রাসী হামলা যতটা না ধর্মীয় বা আঞ্চলিক, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। ঘটনাটিকে একটি ঠান্ডা মাথার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলেই মনে হচ্ছে, যার লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করে ক্ষমতা ও জনমতের পক্ষে জোয়ার সৃষ্টি করা। যেহেতু গোটা ঘটনাটি সেনা অধ্যুষিত এক অঞ্চলে সংঘটিত, যেখানে কোনো অজানা মুখ প্রবেশই প্রায় অসম্ভব, তাই সাধারণ নাগরিকের প্রশ্নই ওঠে : এই হামলার নেপথ্যে আসলেই কারা? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই ঘটনার গভীরে গিয়ে তদন্ত করা এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করা। নিরীহ নাগরিকদের জীবন নিয়ে রাজনীতি করা যেকোনো সভ্যসমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...