রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

কেশবপুরে খ্রিষ্টিয়ান আউট রিচ সেন্টারে উপজাতি কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে লুকোচুরি ?

  • প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৫, ৮:১১ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১ বছর আগে
ক্রা ইম রিপোট:-    কেশবপুরে খ্রিষ্টিয়ান আউট রিচ সেন্টারে উপজাতি কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যু: আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা?
যশোরের কেশবপুরে একটি খ্রিষ্টান মিশনারি পরিচালিত ছাত্রী নিবাসে রাজেরুং ত্রিপুরা (১৫) নামে এক কিশোরীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তার পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড।
নিহত রাজেরুং ত্রিপুরার পিতা রমেশ ত্রিপুরা কেশবপুর থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে জানান, তিনি তার মেয়েকে দারিদ্র্যের কারণে কেশবপুরের খ্রিষ্টিয়ান আউট রিচ সেন্টার-এ রাখেন। কিন্তু গত ১৩ মার্চ দুপুরে রাজেরুং মোবাইল ফোনে জানান যে, স্কুল বন্ধ হলেও তাকে হোস্টেল থেকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে না এবং পরিচালক খ্রিষ্টফার সরকারসহ (৫১) কয়েকজন ব্যক্তি তাকে উসকানিমূলক কথা বলছেন ও যৌন হয়রানি করছেন।
এরপর ১৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে ফেসবুকের মাধ্যমে রাজেরুংয়ের আত্মহত্যার খবর জানতে পারেন তার পরিবার। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, ১৪ মার্চ মেয়েটির মৃত্যু হলেও মিশনারি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি গোপন রেখেছিল এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অর্থের প্রলোভন ও হুমকি দেওয়া হয়।
রাজেরুংয়ের পিতা রমেশ ত্রিপুরা অভিযোগ করেছেন, তার মেয়েকে হত্যার জন্য পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং বিবাদীরা তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী ও এলাকাবাসী বলছেন, রাজেরুং আত্মহত্যা করেননি, বরং তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
রাজেরুং ত্রিপুরা সহপাঠীদের দাবি মিশনের ম্যানেজার তাকে ধর্ষণ করেছে হয়তো অপমানে আত্মহত্যা করেছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, মেয়েটির মরদেহ নিয়ে পুলিশ গোপনীয়তা অবলম্বন করেছে, এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি, বরং অপমৃত্যু মামলা রুজু করেছে।
এই ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, বান্দরবানের থানচির কালুপাড়া এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে রাজেরুংকে শিক্ষার জন্য কেশবপুরের মিশনারি পরিচালিত ছাত্রাবাসে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, শুধুমাত্র শিক্ষা নয়, উপজাতি মেয়েদের ধর্মান্তরিত করাসহ যৌন হয়রানি করা হচ্ছে।
বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে খ্রিষ্টান মিশনারিরা দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। চাক, ত্রিপুরা, মারমা, বম, চাকমা সহ অনেক উপজাতি সম্প্রদায়ের হতদরিদ্র পরিবারগুলোর সন্তানদের শিক্ষা ও আশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, রাজেরুংকে যৌন হয়রানির পর হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু পুলিশ প্রভাবশালী মিশনারিদের চাপের মুখে নিরপেক্ষ তদন্ত করছে না। কেশবপুরের খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার একাধিক সদস্য এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, থানচির আরও তিন ছাত্রী—রেবেকা ত্রিপুরা, স্বস্তিকা ত্রিপুরা, ও জসিমতা ত্রিপুরা—যারা ওই মিশনারি পরিচালিত ছাত্রাবাসে ছিল, তারা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহায়তায় উদ্ধার হয়েছেন।
রাজেরুং ত্রিপুরার পিতা কেশবপুর থানায় বিবাদীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত মূল আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিষয়টি সঠিক তদন্তের আওতায় এনে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করলে, প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর প্রশ্ন নয়, বরং উপজাতি সম্প্রদায়ের দারিদ্র্য, ধর্মান্তকরণের কৌশল ও যৌন নিপীড়নের মতো গভীর সংকটগুলোর প্রতিচ্ছবি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কী ভূমিকা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মানবাধিকার সংগঠন ও উপজাতি আঞ্চলিক দলগুলো বরাবরই ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ নিয়ে সরব থাকলেও, অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্মান্তরকরণ বা খ্রিস্টান মিশনারীদের কার্যক্রম নিয়ে তারা নীরব থাকেন। চাকমা, মারমা, চাক সম্প্রদায়ের অনেকেই বৌদ্ধ ও ত্রিপুরাদের মধ্যে হিন্দু ধর্মের অনুসারী রয়েছে এবং বম, খিয়াং, মুরংদের একটি অংশ প্রকৃতি পূজারী হলেও অনেকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করছেন।
বিশেষ করে, মিশনারীদের দ্বারা উপজাতি মেয়েদের শারীরিক নির্যাতন ও ধর্মান্তরকরণের ঘটনা নিয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। অথচ, কোনো উপজাতি মেয়ে যদি ভালোবেসে মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে, বা বিচ্ছিন্নভাবে কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখনই তাদের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত মানসিকতা ও পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব চিত্রকে আরও জটিল করে তুলছে।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...