মানবিক করিডোর নাকি ভবিষ্যতের সামরিক ঘাঁটি? আজ টেকনাফ সীমান্তে যে হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর গঠনের আলোচনা চলছে, তা আদতে একটি নতুন বাফার জোন তৈরির সূচনা হতে পারে। সেই করিডোরে জাতিসংঘ থাকবে, আন্তর্জাতিক NGO থাকবে, থাকবে বিদেশি পর্যবেক্ষক, বিদেশি কনভয়। ফলাফল? বাংলাদেশের সীমান্তের একাংশে আমরা হারাবো নিজস্ব সার্বভৌম কর্তৃত্ব। একবার কোন দেশ মানবিক করিডোরে রাজি হলে, সেই করিডোর আর তাদের থাকে না। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে খেলবেন না। খুব খারাপ হবে খুব। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ মানবিক করিডোর বানিয়েছিলো— ফলাফল? Permanent NATO base. ইরাকে ”No fly zone” নামে তৈরি করা হয়েছিল মানবিক করিডোর— ফলাফল? প্রতিষ্ঠিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও দীর্ঘমেয়াদি দখল। ২০১১ সালে মানবিক সহায়তা এবং নাগরিক সুরক্ষার নামে NATO ও UN লিবিয়ার বেনগাজিতে মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠা করে। ফলাফল? লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পথ তৈরি করে এবং দেশটিকে টুকরো টুকরো করে দেয়। আজ অবধি লিবিয়া আর একটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি। সিরিয়ার আলেপ্পো, ইদলিব ও রাকা অঞ্চলে মানবিক করিডোরের প্রতিষ্ঠার নামে যে পশ্চিমাদের অভ্যন্তরীণ করিডোর তৈরি করা হয়েছিল — ফলাফল? সিরিয়ায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ। ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নামে মানবিক সহায়তা এবং UN কার্যক্রম শুরু হয়।
পরবর্তীতে এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে এক বিস্ফোরক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় যেখানে মানবিক করিডোরের মধ্য দিয়েই অস্ত্র, যুদ্ধজিনিসপত্র যাতায়াত করেছে— ভুলে যাচ্ছি আমরা? আফগানিস্তানেও শুরুটা হয়েছিল মানবিক সহায়তা দিয়ে, শেষটা কোথায় গেছে আমরা সবাই জানি।
গত সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জাতিসংঘের তত্ত¡াবধানে শর্ত সাপেক্ষে মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের জন্য করিডোর দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা রাখাইন রাজ্যে করিডোরের ব্যাপারে সম্মত হয়েছি। কারণ, এটি একটি মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ হবে। তবে আমাদের কিছু শর্ত আছে। সেই শর্ত যদি পালন করা হয়, অবশ্যই আমরা জাতিসংঘের তত্ত¡াবধানে সহযোগিতা করব।’ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জাতিসংঘের অনুরোধে এ ধরনের করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেও একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘মানবিক করিডোর’ স্থাপন নিয়ে সরকার জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেনি। তবে যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে’। অন্তর্বর্তী সরকারের এই দুই ধরনের বক্তব্যের ধূম্রজাল প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত করিডোর ইস্যুতে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা। এর আগে মার্কিন রণতরী আসার জন্য ২৯ জানুয়ারি ৯ মাসের জন্য সেন্টটমার্টিন যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর এম শহীদুজ্জামান বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি থেমে থাকে না। কিন্তু মিয়ানমারকে মানবিক করিডোর দেয়া নিয়ে কথা বলা পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এতে সন্দেহ হয়। সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আছেন। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টার কথা বলা উচিত। প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানকে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি কোথায়? করিডোর কেমন হবে, কী যাবে, শর্ত কী হবে, তা অবশ্যই জানাতে হবে। এগুলো না জানালে সন্দেহ তৈরি হবে।’
চলতি বছরের প্রথমার্ধে গৃহযুদ্ধে পর্যুদস্ত মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকান রাজ্যে দুর্ভিক্ষ হতে পারে শঙ্কায় রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশকে ‘করিডোর’ দেওয়ার অনুরোধ করেছিল জাতিসংঘ। এই অনুরোধে সরকার করিডোর দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু এবিষয়ে সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ায় সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টিটিভ ড. খলিলুর রহমান স¤প্রতি কক্সবাজারে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অবস্থা রোহিঙ্গাদের নিরাপদভাবে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব নয়। তবে তার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা করছে সরকার। তিনি কক্সবাজার শহরের রাখাইন পল্লীতে জলকেলি উৎসব উপলক্ষ্যে ‘শুভ রাখাইন সাংগ্রেং ১৩৮৭’ শীর্ষক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এতে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তার এই নেতিবাচক বক্তব্য করিডোর দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিনা?
২০১৭ সালে আরাকান অঞ্চলের লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার জান্তা সরকার ও আজকের আরাকান আর্মি নামের মিয়ানমারের বিদ্রোহী শক্তির যৌথ অভিযানে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। আজকের দিনে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় দেড় মিলিয়ন রোহিঙ্গাদের তাদের নিজের ভ‚মিতে প্রত্যাবাসন।
এনিয়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন রাশিয়া ও মিয়ানমারসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ইতিমধ্যে সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি বিষয়টি দেখভাল করেছেন। ইতোমধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার জান্তা সরকার সম্মতও হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তঃদেশীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই রাখাইন অঞ্চল মাদক, অস্ত্র এবং নারী ও শিশু পাচারের অবাধ ক্ষেত্র হিসাবে পরিচিত। মানবিক করিডোর দিয়ে এসব অবৈধ কারবার বাড়বে, এমন আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, করিডোর না থাকায় কি এসব অপকর্ম বন্ধ আছে? রাখাইন থেকে যারা বিশেষ করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে চায়, তারা এই করিডোর সহজেই ব্যবহার করতে পারবে। এর ফলে অনুপ্রবেশ আরো বেড়ে যাবে। এ কথা কারো অজানা নয়, মিয়ানমার থেকে প্রতিদিনই অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও ঘরবাড়ি হারানো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। গত কয়েক মাসে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বারবার প্রমাণিত হয়েছে, মিয়ানমার জান্তা সরকার যেমন রোহিঙ্গাদের মিত্র নয়, তেমনি আরাকান আর্মিও তাদের মিত্র নয়। জান্তার নিরাপত্তা বাহিনী, জঙ্গী ও আরাকান আর্মির সদস্যরা সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তারা এক সময় একজোট হয়েই রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-নির্যাতন, বাড়িঘর দখল ও অগ্নি সংযোগের তাÐব চালিয়েছে। আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব দখলের পরও তারা একই ধরনের আচরণের শিকার হচ্ছে। এছাড়াও স¤প্রতি বাংলাদেশ সীমান্তে আরাকান আর্মীর তৎপরতা নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। আরাকান কর্মকাÐে সীমান্তের জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের সন্দেহ সীমান্তে মানবিক করিডোর! আরাকান আর্মির স্বার্থে?